02
Aug

উষ্ণ মৌসুমেও অন্দরে শীতল আমেজ……

আকাশে নেই সাদা মেঘের ঘনঘটা। টানা প্রাণান্তকর গরম থেকে কবে মুক্তি মিলবে, তা নিয়েও কোনও আশার বাণী শোনা যাচ্ছেনা। ঠাণ্ডা পানি, ফলের জুস আর আইসক্রিম, বরফ খেয়ে না হয় সাময়িক শরীর টাকে জুড়িয়ে নেয়া যায়। কিন্তু বাইরের দুর্বিষহ ভ্যাপসা গরম আমাদের হেস্তনেস্তও করে ফেলছে। তাই সারাদিনের ধকল পাড়ি দিয়ে বাসায় গিয়ে ঠাণ্ডা পানি দিয়ে একটা লম্বা গোসল আর অন্দরের স্নিগ্ধতা মনে ফিরিয়ে আনে প্রশান্তি।

আসলে বাইরের ঝক্কি ঝামেলায় আমাদের কোনও হাত থাকেনা। সব থাকে আমাদের আয়ত্তের বাইরে। কিন্তু অন্দরে যদি নিয়ে আসি খানিকটা শীতল আমেজ তবে তা কিন্তু মন্দ না। আসলে এই তপ্ত আবহাওয়ায় অন্দরের শীতল অভ্যর্থনা সবার কাছেই কাম্য। আর তাই চার দেয়ালের এই নীড়ে সিগ্ধতার জন্য খুব বেশী আয়জনের মহামারি করতে হবেনা। একটু ভাবনা চিন্তা করলেই আর পারিপার্শ্বিক কিছু সচেতনার মাধ্যমেই গরমের এ উষ্ণ হাওয়াতে আপনার অন্দর রাখতে পারেন স্নিগ্ধ এবং নির্ঝঞ্ঝাট।

মূলত, ঘর শীতল রাখার বিষয়টি বাড়ি বা ফ্ল্যাট নির্মাণের সময়ই খেয়াল রাখতে হয়। এক্ষেত্রে সম্ভব হলে, বাড়ি বা ফ্ল্যাট উত্তর-দক্ষিণ দিক করে তৈরি করাটাই ভালো। কেননা, দক্ষিণ দিক থেকে বাতাস ঢুকে উত্তর দিক দিয়ে বের হয়ে যেতে পারে। যা সারকুলেশনের জন্য খুব ভাল হয়। কারন, এতে করে গরম বাতাস বের হয়ে যেতে পারে। মূলত, অন্দরের কোন অংশটিতে সবচেয়ে বেশি বাতাস আসা যাওয়া করে তা লক্ষ্য করতে হবে। তাহলে সেই অংশের জানালা সার্বক্ষণিক খোলা রাখতে পারবেন। এর ফলে সূর্যাস্তের পরেও আপনার ঘরে বাতাস আসা যাওয়া করবে।

6তবে ভাড়া বাসায় আসলে সব সম্ভবপর হয়না। দেখা যায় যে, যিনি ভাড়া থাকবেন, সেই ফ্লোরটি পশ্চিম দিকমুখী তৈরি করা। সেই ক্ষেত্রে, সূর্যের আলো যেন কম প্রবেশ করে সে ব্যবস্থা অবশ্যই করতে হবে। বিশেষ করে, ঘরের যে অংশে রোদ পড়ে, সেদিকের জানালায় আলোনিরোধী কাচ ব্যবহার করুন। খরচ কমাতে চাইলে কাঠ বা স্টিলের পাতলা প্লেনশিটের জানালা দেওয়া যেতে পারে। কিংবা, জানালার কাচগুলোয় সাদা রং করে দিতে পারেন।

অন্দরে শীতলতার জন্য চমৎকার ম্যাজিকের মতন কাজ করে গাছ। আকারে আকৃতিতে ছোটও বা বড় হোক, ঘরে একটা ঠাণ্ডা অনুভুতির জন্ম দেয় গাছ। তাই উচিৎ হলও, ঘরের ভেতর ও বারান্দায় ছোট বড় সুবিধামতন গাছ লাগানো।  এতে শুধু তাপমাত্রা কমবে তা-ই নয়, সাথে ঘরের ভেতরের বাতাস স্বাস্থ্যকরও হয়ে উঠবে। এছাড়া, যদি নিজের জায়গা সহ বাড়ি থাকে তবে যথাসাধ্য চেষ্টা করবেন বাড়ির পূর্ব ও পশ্চিম পাশে বেশি করে গাছ লাগান। যদিও এই ব্যাপারটি হলও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। কারণ, বাসার আশেপাশে গাছ থাকলে সরাসরি সূর্যের আলো পড়ে না যার ফলে ঘরের পরিবেশ ঠাণ্ডা থাকে। শুধু তাই নয়, ঘর ঠাণ্ডা রাখতে ছাদে ঝোপজাতীয় ছোট ছোট গাছ লাগানো উচিৎ। কিংবা ছোট ছোট মাচার মতো করে গাছ লাগান আর লতানো গাছ বিল্ডিংয়ের চারদিকে নামিয়ে দিন। এতে বাড়ির দেয়ালও ঠাণ্ডা থাকবে।

বর্তমান সময়ে আমার অন্দর সজ্জায় দেয়ালগুলোকে উজ্জ্বল রঙে রাঙাতেই ভালবাসি। কিন্তু এই তপ্ত গরমে এই উজ্জ্বল রঙগুলো যেনও আমাদের তাড়া করে বেড়ায়। তাই, যদি সম্ভব হয় দেয়ালে যতটুকু সম্ভব হালকা রঙে রাঙ্গানোই ভালো। আর যাদের অন্দর আগে থেকেই সাদা রঙে রাঙানো, তাদের চিন্তার কিছু নেই। দেয়ালের সাদা রঙ আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মিকে প্রতিহত করে প্রাকৃতিকভাবে ঘরকে ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে। দেয়ালের রঙের মতোই পর্দা, বিছানার চাদর, বালিশের কাভার বা কুশন কাভার সবকিছু হালকা ফেব্রিকের করে নিন। আর পর্দার আবশ্যকতা না বললেই নয়। গরমকালে সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন জিনিসের একটি মনে হয় ঝুলন্ত পর্দার বাতাসে আলোড়িত হওয়ার দৃশ্য। পর্দা যেমন উজ্জ্বল রোদ ঘরে ঢুকতে দেয়না, তেমনি ঘরের ভেতর বাতাস বইতেও সহায়তা করে। গরমের সময় ঘরের শান্তি আর স্নিগ্ধতা বজায় রাখতে নির্বাচন করতে হবে, হালকা বা হালকা উজ্জ্বল রং ও ছিমছাম নকশা করা পর্দা। আসলে, ঘরের পর্দায় এমন রঙ ব্যবহার করতে হবে যা বাইরের তাপমাত্রা শুষে না নিয়ে প্রতিফলন করতে সক্ষম। তবে জানালায় কাপড়ের পর্দা ব্যবহার করতে চাইলে সুতি কাপড় ব্যবহার করাই ভালো। যাতে অতিরিক্ত তাপ ঘরের ভেতরে আটকে না থাকে। মেঝের ক্ষেত্রে ভারী কার্পেট উঠিয়ে ফেলাই ভালো। নিতান্তই যদি ব্যবহার করতে হয়, তবে বেছে নিতে পারেন শীতল পাটি, কিংবা দেশীয় শতরঞ্জি। ঘরের সাজে নান্দনিকতার ছোঁয়া যেমন থাকবে, তেমনি আরামটাও বজায় থাকবে পুরোপুরি। আর বারবার মেঝে ঠাণ্ডা পানি দিয়ে মুছলে তাপমাত্রার ভারসাম্য বজায় থাকবে সুন্দর ভাবে।

ar 2একটা ব্যাপার মাথায় রাখতে হবে, অযথা কোনও ইলেক্ট্রনিক যন্ত্র চালিয়ে রাখা একদম ঠিক নয়। এর ফলে ঘরের তাপমাত্রা আরও বেড়ে গিয়ে অতিরিক্ত গরম আবহাওয়া তৈরি করে। আর এই জরুরী ব্যাপারটা প্রকৃতির যেকোনো মৌসুমের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। বিনা প্রয়োজনে ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রপাতি অবশ্যই বন্ধ করে রাখা উচিৎ। এছাড়াও, রান্নাবান্নার কাজ ছাড়া গ্যাসের চুলা বন্ধ রাখতে হবে। এর ফলেও ঘরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। কারণ গ্রীষ্মের উত্তাপে নয় জাতীয় সম্পদ রক্ষার্থে এই দায়িত্ব আমাদের পালন করা অত্যন্ত জরুরী। তাছাড়া রান্না করার সময় ও পরে রান্নাঘরের সমন্বয়ক পাখাটি ছাড়তে ভুলবেন না। এতে করে গরম বাতাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে না। ফলে ঘরের তাপমাত্রা থাকবে সহনীয় ও স্বস্তিদায়ক।

আর বরাবরের মতই অন্দরে যথাসম্ভব হালকা আসবাব গ্রহণযোগ্য। ভারী ভারী অনেক আসবাবের বদল হালকা বহুমাত্রিক কাজে ব্যাবরিত আসবাব সবসময়ই গ্রহণযোগ্য। আর আসবাবের মাঝখানে চলাচল আর বাতাস আসা যাওয়ার পর্যাপ্ত জায়গা থাকা খুব জরুরী। আর ঘরের আসবাব যদি হয় পরিবেশবান্ধব তাহলতো আর কথাই নেই।। যদি অন্দরে থাকে  কাঠ, বাঁশ, বেতের তৈরি আসবাব তবে প্রকৃতির খুব কাছে থাকার অনুভূতি তো পাওয়াই যাবে, সাথে সাথে এসব উপাদান গরমে অন্দরে এনে দেবে শান্তির শীতল ছোঁয়া।

 

এইসব শলা পরামর্শর পরও গরম তাড়াবার একটা সনাতনী উপায় আছে। যা এখনও মানুষ গ্রীষ্মকালে সচরাচর করে থাকে। রাতের প্রচণ্ড ভ্যাপসা গরমে যদি এসির যান্ত্রিক বাতাস না থাকে তবে আপনার টেবিল ফ্যান বা ছোট্ট পোর্টেবল ফ্যানও যদি থাকে তবে তার সামনে গামলা ভর্তি বরফ সহ পানি রেখে ফ্যান চালিয়ে দিন। একদম ঠাণ্ডা হয়ে যাবেন কিন্তু তাৎক্ষণিক এই ঘরোয়া এসির বাতাসে।

আর অন্দরে নির্মল পরিবেশের সবচেয়ে সহজ উপায় হলও পরিচ্ছন্নতা। যতোটুকু সাধ্যের মধ্যে থাকবে অন্দর পরিষ্কার রাখতে হবে। দৈনন্দিন পরিচর্চা আর প্রকৃতির নির্মল আলো বাতাস আমাদের এমনিতেই শীতলতায় জুড়িয়ে দেয়। আর প্রাকৃতিক ঋতুর এই বিচিত্রতা আছে বলেইতো আমরা দেশটা এতো সুন্দর।