21
Apr

চার দেয়ালের গাঁথুনি …………………

চার দেয়ালের এই গাঁথুনির সাথে দীর্ঘ পনেরো বছরের বছরের সখ্যতা আমার । আমার আমি যখন বেড়ে উঠেছি, তখন তার দৃঢ় গাঁথুনি গুলো যেনও আরও পোক্ত হয়েছে। আমার আপন দুঃখগুলো, আনন্দগুলো , উপচে পরা দুষ্টুমিগুলো যেনও ধারন করে রেখেছে এই দেয়ালগুলো।

পেশাগত কারনে হোক, আর মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপার-স্যাপার হোক, স্থাপত্যবিদ্যার মানুষ আমি, তাই ঘরটাকে সাজিয়েছি এমনভাবে যেনও হাতের মুঠোয় চলে আসে পুরো জগত সংসার! যদিও উড়ন্ত কিশোরীর মতন এখনো রুমের দেয়ালগুলোকে আমি হাওয়াই মিঠাই গোলাপি রঙেই রাঙিয়ে রেখেছি। আর সেই গোলাপি দেয়ালে অনবরত খেলায় মেতে থাকে চারটি প্রজাপতি। হোকনা তা কৃত্তিম, অনুভুতি জাগাতে বিন্দুমাত্র পিছপা হয়নি এই রঙিন প্রজাপতিগুলো।

তবে দিনের আলোর চেয়ে রাতের গভীরতাই সবসময়ই আমাকে বেশী আকর্ষণ করে। তাই আমি আমার রুমে দিনের আলোর কোন প্রবেশাধিকার দেইনি। সারাদিন ব্যস্ততার পর রাতের স্তব্ধতাই যেনও অনেক বেশি সারল্য প্রকাশ করে। ঘরের দরজা খুলে ঢুকতেই উইন্ড চাইমের রিনিছিনি পারি দেবার পর ছোট্ট লাল কার্পেটে পা দিতেই সামনে আমার বিশাল একটা চতুর্ভুজাকার মেঝের বিছানা। বিছানার পাশেই আছে হালকা হলদে আলোর একটা বাশবেতের ল্যাম্প শেড। ভারী পর্দার আড়ালে সূর্য মামা ভুলেও আমার রুমে উঁকিঝুঁকি দিতে পারেনা। আর আসবাবের কথা বলতে গেলে, আমার এই হাওয়াই মিঠাই রুমে গাড় দুধ-কফি মিশেল রঙের ছোট্ট দুটি বসার স্টুল, একটি ওয়াকিং ক্লসেট আর অবশ্যই আমার অর্ধেক জীবনের অস্তিত্ব ধারণকারী কম্পিউটার টেবিল।

এবার আসা যাক রুমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশে। আমার দোলনা কাহিনী। সারাদিনের ঝক্কি ঝামেলা পারি দিয়ে নিজেকে সময় দিতে বেজে যায় রাত একটা কি দুটা। মনের অবস্থার সাথে ভারসাম্য রেখে রুমের বাতিগুলো নিভিয়ে গান ছাড়ার পর দোলনার দুলুনিকে স্বর্গের সাথে তুলনা করতেও আমি দ্বিধা বোধ করিনা।

রাত দুটো। ভারী পর্দার বেড়াজালে বর্গাকৃত প্রিয় রুম আমার। ল্যাম্প শেডের হলদে মৃদু আলোয় ঘরকে করে তুলে অনেকবেশি মায়াময়। যদিও আমার পরিবারের সদস্যদের কাছে এই পরিবেশ হলও এক নির্ভেজাল রহস্য।

হোকনা খানিক রহস্য। নিস্তব্ধ গম্ভীর রাতে নিজের আরাম আয়েশের বিছানায় কোলবালিশটিকে জড়িয়ে ধরি।  তখন কানে বাজতে থাকে বাথরুমের টুপটাপ পানির শব্দ, উইপকার  তীক্ষ্ণ ধারাল দাঁতের খচখচানি কিংবা অবাধ্য ঘড়ির কাটার বিরামহীন যান্ত্রিক শব্দ।

এই চার দেয়ালের ইটের গাঁথুনি মজবুত করেছে আমার সম্পর্কের মূল্যবোধ। কতো যে চোখের পানি, নাকের পানি, আর আনন্দ উল্লাস ভাগাভাগি করে অতীতকে অম্লান করে রেখেছে আমার এই রুমটি। হয়তোবা সময়ের তাড়নায় এক সময় স্মৃতি গুলো হালকা হবে। কিন্তু দেয়ালের ভারী দাগগুলোই দলিল হয়ে থাকবে বর্তমান হয়ে।