‘বিশেষ শিশু’র যত্নে – বিশেষ অন্দর

‘বিশেষ শিশু’র যত্নে – বিশেষ অন্দর

অটিসম কোনও অভিশাপ বা অপরাধ নয়। বরং একজন অটিস্টিক শিশুকে যদি উপযুক্ত পরিবেশ করে দেয়া হয় তবে সেই শিশুটিই হবে আমাদের জন্য আশীর্বাদ। একটু লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, অটিস্টিক শিশুদের ক্ষেত্রে তাদের উপযুক্ত স্কুল বা পুনরবাসন কেন্দ্র  রয়েছে কিন্তু তা খুব সীমিত পর্যায়ে। এর বাইরে এই বিশেষ শিশুটি  একটা লম্বা সময় ধরে যে নিজ অন্দরে থাকে তখন তার জন্য উপযোগী কোনও পারিপার্শ্বিক ব্যবস্থাই থাকেনা। তাই প্রতিটি স্বাভাবিক মানুষের মত এই বিশেষ শিশুটির জন্যও আবশ্যিক হয়ে দাঁড়ায় তার পরিপ্রেক্ষিতে ‘উপযুক্ত পরিবেশ’।

একজন অটিস্টিক শিশুর উপযুক্ত পরিবেশের জন্য অনেক জরুরী ব্যাপার রয়েছে। এর মধ্যে নিজ অন্দরের জন্য খুবই প্রয়োজনীয় হয়ে দাঁড়ায় – আরামদায়ক শয়নকক্ষ, শিশুটির মাপ গড়ন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আসবাব, প্রাকৃতিক এবং কৃত্তিম আলোর পরিমিত সমাহার, পরিশীলিত শব্দ ব্যবস্থা (সাউন্ড সিস্টেম) এবং অবশই  প্রাত্যহিক থেরাপির জন্য ‘সেন্সরি রুম’ (থেরাপি রুম) এর আবহ।

‘বিশেষ শিশু’র যত্নে – বিশেষ অন্দর 1

মুলত নিজ অন্দরে একজন অটিস্টিক শিশুর জন্য যদি তার ধরন অনুযায়ী আবহ তৈরি করতে হয় তবে ঘরের মেঝে থেকে শুরু করে ঘরের দেয়াল ও দেয়ালের রঙ, কৃত্তিম ছাদ (ফলস সিলিং), আসবাব, কৃত্তিম আলো (লাইটিং), সাউন্ড সিস্টেম, ফেব্রিকেশন, পর্দা সবকিছুতেই পুঙ্খানুপুঙ্খ নজর রাখতে হবে। সবার প্রথম যদি ঘরের মেঝে নিয়ে ভাবতে হয় তবে অবশ্যই তা সাধারন টাইলস বা মোজাইক মেঝের কথা চিন্তাই করা যাবেনা। কারন ধরণ অনুযায়ী একেকজন অটিস্টিক শিশু একেক রকম হয়ে থাকে। শক্ত বা কঠিন মেঝে তাদের জন্য আপত্তিকর হয়ে দাঁড়ায়। এক্ষেত্রে তাদের রুমের মেঝে অবশই কর্ক বা রাবার প্যাডের নরম ফ্লোর হতে হবে। এর পাশাপাশি ঘরের দেয়ালও তাদের উচ্চতা অনুযায়ী করে নিতে হবে নরম আবরণে ঢাকা। অর্থাৎ কোন কারনে দেয়ালে যেন বারি বা ধাক্কা লাগলেও  ব্যাথা না পায় তাই দেয়ালেও রাবার প্যাড দিয়ে  ঢেকে দিতে হবে।

 

দেয়াল নরম আবরণ দিয়ে কাভার করার পর যে জায়গাটুকু বাকি থাকবে তা অবশ্যই হালকা কোনও রঙে রাঙাতে হবে। এবং দেয়ালের রঙ নির্বাচনের সময় অবশই খেয়াল রাখতে হবে তা যেনো  ম্যাট ফিনিশ এবং শিশা মুক্ত থাকে (নন গ্লসি – লিড ফ্রি)। আর  প্রাকৃতিক আলো এবং রোদ সবসময় তাদের জন্য সহনশীল নাও হতে পারে। তাই জানালায় ব্যাবহার করতে হবে ব্ল্যাক আউট রোলার ব্লাইন্ড। এতে করে প্রাকৃতিক আলোর যথাযথ ব্যাবহার সুবিধা ও ইচ্ছে অনুযায়ী করতে পারবে। পাশাপাশি অটিস্টিক শিশুদের জন্য কৃত্তিম আলোর এক বিশাল ভুমিকা রয়েছে। সাধারনত সেন্সরি রুমে তারা ফাইবার গ্লাস লাইট ব্যাবহারে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। তাই তাদের সুবিধার কথা চিন্তা করে রুমে ব্যাবহার করা হয় বাবল টিউব লাইট। এই লাইটিং তাদের মনসংযোগে সাহায্য করে এবং অনাকাঙ্ক্ষিত উদ্দীপনাকে শিথিল করে। ল্যাম্পশ্যাড জাতীয় জিনিশ না রাখাই সবচেয়ে ভালো। আর অন্যান্য বৈদ্যুতিক জিনিশ যেন হাতের নাগালের বাইরে ঢাকা অবস্থায় থাকে সেই ব্যাবস্থাও করতে হবে । এর পাশাপাশি প্রয়োজন তাদের মুড, আগ্রহ এবং পছন্দের সাথে সামঞ্জস্য রেখে সাউন্ড সিস্টেমের ব্যবস্থা রাখা। সাধারনত এক্ষেত্রে ওয়াল মাউন্টেড সাউন্ড সিস্টেমকেই বেশি প্রাধান্য দেয়া হয়ে থাকে।

‘বিশেষ শিশু’র যত্নে – বিশেষ অন্দর 2

আরেকটি খুব গুরুত্বপূর্ণ এবং জরুরী ধাপ রয়েছে অটিস্টিক শিশুর রুম তৈরিতে। আর তা হল আসবাব। অটিস্টিক শিশুর রুমে অযথা এবং অযাচিত আসবাবে ভরে ফেলা একদম উচিত নয়। বরং শিশুর বয়স, মাপ এবং গড়ন অনুযায়ী তার ব্যাবহারের প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দিষ্ট ও পরিকল্পিত আসবাব বানানো একান্ত জরুরী। এক্ষেত্রে অবশই খেয়াল রাখতে হবে আসবাবের কোন কোণা যেন শার্প বা তীক্ষ্ণ না হয়। সবসময় আসবাব নির্বাচন করতে হবে খুব সুন্দর ভাবে পলিশ এবং  নরম কাপড়ে মোড়ানো (সফট ফেব্রিকেটেড)। এতে করে তাদের কোন ব্যাথা বা দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা থাকবেনা। তাছাড়া অনেক ভারি ফ্রেমিং বা নকশায় ভরপুর আসবাব না রেখে সাধারন ও কার্যকরী আসবাব রাখাই শ্রেয়। কিছু স্টোরেজ ইউনিট করে দিলেও ভাল হয়। যেন তারা তাদের খেলনা বা তাদের যা প্রয়োজন মনে হয় তা যেনও নিজ দায়িত্তে গুছিয়ে রাখতে পারে। এতে করে তাদের নিজের মধ্যে আত্মবিশ্বাস বোধ বেড়ে উঠবে। অটিস্টিক শিশুদের জন্য সবসময় ব্যাবহার করা হয়ে থাকে এক বিশেষ ধরনের ফেব্রিক। যা অত্যন্ত আরামদায়ক, মিহি এবং নরম পশমি তন্তুর হয়ে থাকে। এই বিশেষ ফেব্রিক মূলত অটিস্টিক শিশুর আসবাব, বিছানা সহ বহুবিধও কাজে ব্যাবহ্রিত হয়।

‘বিশেষ শিশু’র যত্নে – বিশেষ অন্দর 3

বারবার একটা ব্যাপারে খুব বেশি সচেতন থাকতে হবে যে, সব অটিস্টিক শিশুর আচার, আচরণ, মুড এবং ধরণ এক হবেনা। তাই সব শিশুর ধরণ এবং তাদের ব্যাক্তিগত আচরনের ভিত্তিতেই তৈরি করতে হবে তাদের আপন ভুবন। কারন আমাদের ভুলে গেলে চলবেনা যে অটিসম একটি শিশুর রোগ নয় বরং তার বিশেষণ। আর এই বিশেষ শিশুর জন্য তার পরিচর্চাও প্রয়োজন বিশেষ ভাবে। আর অন্দর থেকেই যদি প্রথম সেই সচেতনতা না বাড়ে তাহলে যতই তার উপযোগী স্কুলিং বা পুনর্বাসন করা হোক তার নিজস্ব বিকাশ সহজে ঘটবেনা। যেহেতু অন্দরে একটা লম্বা সময় সে তার পরিবারের সাথে সময় কাটাবে তাই তার পরিবাবের একান্ত দায়িত্ব এবং কর্তব্য শিশুটিকে যথাযথ ভাবে গড়ে উঠার এবং মানসিক বিকাশ ঘটানোর উপযুক্ত পরিবেশ গড়ে দেয়া।

অনেকসময় অটিস্টিক শিশুর যথাযোগ্য অন্দর গড়ে তোলা অনেক ব্যয় সাধ্য ও ধৈর্য্য বহুল হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু যদি সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে তাদের আচরনের উপর নির্ভর করে জরুরি ও আবশ্যক জিনিসগুলো তুলে ধরে তৈরি করা হয় তবে অবশ্যই তা সাধ এবং সাধ্যের মাঝেই বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। তাই অটিস্টিক শিশুর রুম নিজ অন্দরে হবে এমন ভাবনা খুব কঠিন বা বিপদের কিছু নয়। বরং সঠিক পরিকল্পনা আর ধৈর্য্যই এক্ষেত্রে সবচেয়ে মুখ্য দিক। এছাড়াও এই ধরনের কাজে যারা পারদর্শী, দক্ষ এবং অভিজ্ঞ তাদের পরামর্শ নিয়ে করা উচিৎ। পাশাপাশি শিশুটির চিকিৎসকের পরামর্শেরও আবশ্যিক প্রয়োজন রয়েছে তার রুম তৈরির ক্ষেত্রে । নাহলে অনেক সময় পারদর্শিতার অভাবে অটিস্টিক শিশুর ক্ষেত্রে তা বিরুপ মনোভাব সৃষ্টি করতে পারে। অন্দরে নিজ পরিবারের সাথে সুস্থ ও নিরাপদ থাকবে প্রতিটি শিশুই; এই প্রত্যাশা এবং কামনা আমাদের সকলেরই। নিজ আবাস্থলেই শুদ্ধ চিন্তা এবং উপযুক্ত শিক্ষায় গড়ে উঠবে আমাদের আগামী প্রজন্ম।